জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১ অনুযায়ি প্রথম শ্রেণির মূল্যায়ন নির্দেশনা

 

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড(NCTB)  বৈশ্বিক ও স্থানীয় চাহিদা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, SDG-2030 এবং বাংলাদেশের ভিশন-২০৪১ কে সামনে রেখে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা-২০২১ প্রণয়ন করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা -২০২১ অনুসারে প্রাথমিক স্তরের (১ম-৫ম শ্রেণি) বিদ্যমান  যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করে জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিমার্জিত এ শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক,শিক্ষক সহায়িকা প্রণয়নের পাশাপাশি মূল্যায়ন ব্যবস্থার ব্যপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।  

২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা বিতরণ করা হয়েছে। এ শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রথম শ্রেণিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা নেয়া হবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের অনুশাসন অনুযায়ী শিশুদের বাড়ির কাজের চাপ কমিয়ে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জন নিশ্চিত করতে পদ্ধতি অনুযায়ী পাঠ উপস্থাপন, যথাযথ ফিডব্যাক, নিরাময়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে মূল্যায়ন ও পুনঃমূল্যায়নের পর রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।     

ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যক্রম সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে শিক্ষক,অভিভাবকসহ ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে শিক্ষাক্রম (আবশ্যকীয় শিখনক্রম ও বিস্তৃত শিক্ষাক্রম), পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা, মূল্যায়ন রেকর্ড টুলস্‌ (প্রতি পিরিয়ডে ব্যবহারের জন্য শিক্ষক ডায়েরি-১, প্রতি অধ্যায় শেষে ব্যবহারের জন্য শিক্ষক ডায়েরি-২, প্রান্তিকভিত্তিক শিখন অগ্রগতির প্রতিবেদন) সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম,২০২১ এর আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নির্দেশিকা সংযুক্ত আছে প্রতিটি শিক্ষক সহায়িকায়।

জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১ শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকের পদক্ষেপ সমূহ নিম্নে ব্যাখ্যা হল- ধরা যাক শিক্ষক প্রথম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

১ম পদক্ষেপ: প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’,২০২৩ এ৫৩ টি পাঠ থেকে প্রান্তিক এর সিলেবাসটুকু চিহ্নিত করবেন। শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঠ নির্বাচন করবেন। নির্বাচিত পাঠটিকে শিক্ষক সহায়িকায় সংযুক্তি হিসেবে থাকা বিস্তৃত শিক্ষাক্রম এর সাথে মিলাবেন। শিক্ষক এখানে বিষয়বস্তুর বিষয়ভিত্তিক ও শ্রেণিভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতা, শিখনফল, শিক্ষণ পদ্ধতি ও পরিকল্পিত কাজ, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও টুলস্‌ এর সাথে পরিচিত হবেন। ধরা যাক- শিক্ষক পাঠ-৯: ‘বাঘ ও রাখাল’ কে নির্বাচন করলেন। শিক্ষক সহায়িকার ২২৪, ২২৭ নম্বর পৃষ্ঠায় এ পাঠের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রয়েছে।   

য় পদক্ষেপ: শিক্ষককে শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর পূর্বেপ্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে শিক্ষক সহায়িকা,২০২৩ থেকে।যেখানে রয়েছে প্রতিটি পাঠের অর্জন উপযোগী যোগ্যতাসমূহপাঠ বিভাজন এবং বিষয়বস্তু (পাঠ্যপুস্তক না থাকলে) ও প্রতিটি পিরিয়ডের পাঠ পরিচালনা সংক্রান্ত নির্দেশনা (শিখনফল, উপকরণ, পদ্ধতি ও কৌশল, শিখন-শেখানো কার্যাবলি), মূল্যায়ন নির্দেশকের (জ্ঞান,দক্ষতা,দৃষ্টিভংগি ও মূল্যবোধ) ধারণাকোন কোন পাঠে শিখনফল নেই সেটি শিক্ষক লক্ষ্য করবেন যেমন- পাঠ ২,৫,৭ এ শিখনফল নেই। কেননা শিখনফল না থাকলে, মূল্যায়ন নির্দেশকও নেই। শিক্ষক সহায়িকাটি থেকে দেখতে পাই, শিক্ষকের নির্বাচিত পাঠ- এর অর্জন উপযোগী যোগ্যতা ৫টি, শিখনফল ৬টি, পিরিয়ড সংখ্যা ৪টি, মূল্যায়ন নির্দেশক-৪টি।

  পদক্ষেপ: প্রয়োজনীয় উপকরণ, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা এবং শিক্ষক ডায়েরি-১ নিয়ে শ্রেণিতে শিক্ষক প্রবেশ করবেন। শিক্ষক সহায়িকার নির্দেশনা অনুযায়ি পাঠ উপস্থাপন করবেন। মূলত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিখন মূল্যায়ন করে ফলাবর্তন প্রদানের তথ্য (K/S/A), ও শিখনফল অর্জনের মান (২/১/০)  লিপিবদ্ধ করবেন ডায়েরি-১ এ। এক্ষেত্রে শিক্ষক পেনসিল ব্যবহার  করবেন। শ্রেণিতে ফলাবর্তন প্রদানের পর পুন:মূল্যায়ন করবেন এবং ডায়েরি-১ এ তথ্য পুনরায় লিপিবদ্ধ করবেন। ফলাবর্তন প্রদানের জন্য ক্ষেত্রগুলোকেই চিহ্নিত করে লিখে রাখতে হবে। জ্ঞানের ক্ষেত্রকে K দিয়ে, দক্ষতা ক্ষেত্রকে S ও দৃষ্টিভংগি ও মূল্যবোধ ক্ষেত্রকে A দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। শিখনফল অর্জনের নির্ধারিত মান হলো: পারেনি (০), আংশিক পেরেছে (১), পেরেছে (২)। কোন শিক্ষার্থীকে যদি ফলাবর্তন দিতে না হয় তবে মান হলো দুই (), যদি একটি/ দুটি ক্ষেত্র ফলাবর্তন দিতে হয় তবে মান হলো এক (), যদি তিনটি ক্ষেত্রে ফলাবর্তন দিতে হয় তবে মান হলো শূণ্য (০)। তবে শ্রেণিকক্ষে কোন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে/ কোনো শিক্ষার্থী ‘শূণ্য’ পেলে তাকে পরবর্তীতে নিরাময়মূলক ব্যবস্থাগ্রহণ ও পুন:মূল্যায়নের মাধ্যমে কমপক্ষে ‘আংশিক পেরেছে’ পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। কোন শিক্ষার্থী আংশিক পারলে (১) তারও শিখনমান বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। আবার উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন একটি  পাঠে করতে না পারলে শিক্ষক পরবর্তী পাঠের সময়ে অবশিষ্টদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। এভাবে শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের  প্রয়োগ হবে । অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী প্রতিটি পিরিয়ডে ২ নম্বরের মধ্যে মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করছে। বিদ্যালয়ে প্রতিদিন ৫টি বিষয়ের পাঠ হয়ে থাকলে শিক্ষার্থী (৫২=) ১০ নম্বরের মধ্যে মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করছে। যা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও পাঠে মনোযোগী করে গড়ে তুলবে। www.nctb.gov.bd এই ওয়েব সাইটে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ ট্যাব এ প্রতি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষক ডায়েরি-১ এর পিডিএফ (পিডিএফ ডাউনলোড-১) ও এম.এস.ওয়ার্ড (ওয়ার্ড ফাইল-১) কপি আপলোড করা আছে। উদাহরণ হিসেবে পাঠ- এর শিক্ষক ডায়েরি-১ টি পূরণ করে দেখানো হল-

Text Box: রোল	নাম	পিরিয়ড-১, মূল্যায়ন নির্দেশক-১
		তারিখ:  ২/১/২০২৩
		           ফলাবর্তন প্রদানের তথ্য	 শিখনফল অর্জনের মান (২/১) 
১	রাহাত	K, S, A	0
২	আদিত্য	S, A	1
৩	সোহাগ	A	1
৪	নাজমুস		2

[বিশেষ দ্র.ব. নাজমুসের ফলাবর্তন প্রদানের তথ্যের ঘরটি খালি, শিখনফল অর্জনের মান ২। অর্থাৎ, নাজমুস ৩টি ক্ষেত্রেই শিখনফল মান অর্জন করতে পেরেছে। রাহাতের শিখনফল অর্জনের মান। অর্থাৎ, রাহাতের জন্য নিরাময়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাহাতের শিখনফল অর্জনের মান অন্তত ১ এ উন্নীত করতে হবে।]

৪র্থ পদক্ষেপ: শিক্ষার্থীদের পাঠ/ অধ্যায়/ ইউনিটভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা এবং পিরিয়ড অনুযায়ি শিখনফল অর্জনের বিবরণী জন্য শিক্ষক ডায়েরি-২ ব্যবহার করা হয়। একই ওয়েব সাইড ও ট্যাব থেকে প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষক ডায়েরি-২ ডাউনলোড করা যাবে। এ ডায়েরি “পিডিএফ ডাউনলোড-2” ও “ওয়ার্ড ফাইল-২” নামে আপলোড করা আছে। শিক্ষক সুবিধাজনক সময়ে ডায়েরি-১ এর সংরক্ষিত তথ্য বা মানসমূহ প্রতিটি পাঠ/ অধ্যায়/ ইউনিট শেষে  শিক্ষক ডায়েরি-২ এ লিপিবদ্ধ করবেন ও অধ্যায়ের মোট মান বের করবেন। লক্ষ্যনীয় যে, শিক্ষক ডায়েরি-২ এ শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জনের মান ‘শূণ্য’ দেয়া যাবে না, শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জনের মান আংশিক পর্যায়ে নিতেই হবে। মন্তব্যের কলামে বাংলা শিক্ষক সহায়িকার পৃষ্ঠা-২২০ অনুযায়ী পাঠ/অধ্যায়/ইউনিট ভিত্তিক শিক্ষার্থীদের নম্বর শতকরায় প্রকাশ করে রাখবেন।

শতকরা মান   

(((মোট মূল্যায়ন নির্দেশকের মান=মূল্যায়ন নির্দেশকের সংখ্যা অথবা ঐ শিক্ষার্থী একটি পাঠের যতগুলো পিরিয়ডের মূল্যায়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিলো  মূল্যায়ন নির্দেশকের সর্বোচ্চ মান)))

উদাহরণ হিসেবে প্রথম শ্রেনির পাঠ- কে নির্বাচন করা হলে-

·        ৪টি পিরিয়ডে, নাজমুসের মোট প্রাপ্ত মান- ৬ নম্বর।

·    মূল্যায়ন নির্দেশকের সংখ্যা- ৪টি। তাহলে, পাঠ-৯ এ ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য মোট মান- ৪  ২ = ৮ নম্বর।

     সুতরাং, পাঠ- ৯ এ নাজমুসের শিখনমান অর্জনের শতকরা মান =  = .৭৫  ১০০%= ৭৫%

 উদাহরণ হিসেবে পাঠ- এর শিক্ষক ডায়েরি-2 পূরণ করে দেখানো হল-

Text Box:





 

৫ম পদক্ষেপ: নির্ধারিত কয়েকটি অধ্যায় নিয়ে প্রান্তিক মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি প্রান্তিক শেষে প্রধান শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট শ্রেণি শিক্ষক প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য শিখন অগ্রগতির প্রতিবেদন (রিপোর্ট কার্ড) তৈরি করবেন। শিক্ষকবৃন্দ এই রিপোর্ট কার্ডে কোনো নম্বর/মান বা গ্রেড উল্লেখ করবেন না, “উত্তম/ভালো/সন্তোষজনক/সহায়তা প্রয়োজন”- লিখবেন। শিক্ষক সহায়িকা,২০২৩ মূল্যায়ন নির্দেশিকার ১.৮.১১ অনু্যায়ী (পৃষ্ঠা-২০৭) শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত শতকরা মান  ০-৩৯% হলে ‘সহায়তা দরকার, ৪০-৫৯% লে সন্তোষজনক, ৬০-৭৯% লে ভালো, ৮০-১০০% লে উত্তম’।  শিক্ষক ডায়েরি-২ থেকে একজন শিক্ষার্থীর প্রতিটি অধ্যায়ের শতকরা মান পাবেন। ধরা যাক বাংলা বিষয়ের প্রথম প্রান্তিকের সিলেবাস হল পাঠ- থেকে পাঠ-১১। শিক্ষার্থী নাজমুস পাঠ- এ নম্বর পেল ৭৫% ,পাঠ-১ এ পেল ৫০%,পাঠ-১ এ পেল ১০০%। ৩টি পাঠের গড় শতকরা (৫+৫+১০০)= ৭৫%। এক্ষেত্রে শিক্ষক নাজমুসের রিপোর্ট কার্ডে ৭৫% এর জন্য লিখবেন ‘ভালো’। একইভাবে অন্যান্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পূরণ করবেন। শিক্ষক সহায়িকা,২০২৩ এর পৃষ্ঠা- ২২১ এ রিপোর্ট কার্ডের নমুনা দেয়া আছে।

এভাবে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রতি পিরিয়ডের ধারাবাহিক মূল্যায়ন থেকে প্রান্তিক মূল্যায়নের জন্য শিখন অগ্রগতির প্রতিবেদন (রিপোর্ট কার্ড) তৈরি করবেন।

Comments

Popular posts from this blog

“বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক অংকন” এই বিষয়ের যোগ্যতা অর্জনে Benjamin Bloom’s Taxonomy অনুযায়ি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর করণীয়-

১ম থেকে ৫ম শ্রেণির গণিত ভীতির সমাধান: চারটি উপকরণ

পাওয়ার পয়েন্টে কনটেন্ট তৈরিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা